E-Learning Info
Go to content

পূর্ববঙ্গ গীতিকা

সাধারণত পূর্ববঙ্গ অঞ্চলের প্রচলিত লোকসাহিত্যকেই একত্রে পূর্ববঙ্গ গীতিকা বলা হয়। লোক সমাজে প্রচিলত ও মুখে মুখে রচিত এর পালাগুলি বাংলাসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। পূর্ববঙ্গ গীতিকার অধিকাংশ পালাই সংগৃহীত। সেই পালাগুলির  প্রধান সংগ্রাহক হলেন : চন্দ্রকুমার দে, দীনেশ চন্দ্র সেন, আশুতোষ চৌধুরী, জসীমউদ্দিন, নগেন্দ্র চন্দ্র দে, রজনীকান্ত ভদ্র, বিহারীলাল রায়, বিজয়নারায়ন আচার্য প্রমুখ। সংগৃহীত পালাগুলি সংখ্যায় অধিক। সেই পলাগুলির মধ্যে উল্লেযোগ্য কিছু পালা হল : মইষাল বন্ধু, কাঞ্চন মালা, কমলারানীর গান, মদন কুমার ও মধুবালা, নেজাম ডাকাতের পালা, দেওয়ান ঈশা খাঁ, মাঞ্জুর মা, কাফেন চোরা, ভেলুয়া, হাতিখেদা, আয়ানাবিবি, কমল সদাগর, চৌধুরীর লড়াই, গোপিনী-কীর্তন, সুজা তয়নার বিলাপ, বারতীর্থের গান, নুরুন্নেহা ও কবরের কথা, পরীবানুর হাঁইলা ইত্যাদি। পালাগুলির অধিকাংশই চৌদ্দ দশকে রচিত। তবে কিছু কিছু পালা আবার ষোলো দশকেও রচিত হয়েছে। সাধারণত এই পালাগুলির রচয়িতা ছিলেন  পল্লির অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত কৃষক, পাটনী প্রভৃতি নিম্নবৃত্তির লোক। জমিদারের দলাদলি বা লোকজীবনের কোনো ঘটনাগুলি ছড়া পাঁচালির রূপে মুখে মুখে এ গুলি রচিত হত। পরে গায়েনের দল সুরারোপ করে এগুলি গ্রামে গ্রামে গেয়ে বেড়াত।
১৯১৩ সালে সর্ব প্রথম চন্দ্র কুমার দে এ রূপ লোকগাথা প্রকাশ করেন। দীনেশ চন্দ্র সেনের সেগুলির উপর দৃষ্টি আকর্ষণ হলে তিনি চন্দ্র কুমারের সাথে সাক্ষাৎস্বরূপ তার সহযোগিতায় পল্লী অঞ্চলের কৃষকদের কাছ থেকে বেশ কিছু গাথা সংগ্রহ করেন । এবং কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অর্থ সহযোগিতায় সেগুলি পূর্ববঙ্গ গীতিকা নামে প্রকাশ করেন।১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি সর্ব প্রথম "Eastern Bengal Ballad' নামে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন। তিনি চার (৪) খন্ডে এটি প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে ক্ষিতীশচন্দ্র মল্লিক (১৯৭১-১৯৭৫) সালে সাত (৭) খন্ডে প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা প্রকাশ করেন। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে আশুতোষ চৌধুরী ও অনেকগুলি পালা সংগ্রহ করেন যা বাংলা একাডেমী থেকে মোমেন চৌধুরী সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ।
১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে দীনেশ চন্দ্র সেনের সম্পাদনায় যে Eastern Bengal Ballads Mymensingh (vol.I.part 1) প্রকাশিত হয়। এরই বাংলা সংস্করণ ময়মনসিংহ গীতিকা'র ১ম  খন্ড ২য় সংখ্যা নামে প্রকাশিত হয় : মহুয়া, মলুয়া,চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারামের পালা, রূপবতী, কঙ্ক ও লীলা, কাজলরেখা এবং দেওয়ানা মদিনা এই দশটি পালাকে নিয়ে । "পূর্ববঙ্গ গীতিকা'র ২য় খণ্ডের ২য় সংখ্যায় মোট (১৪) চৌদ্দটি গীতিকা স্থান পেয়েছে। সেই গীতিকা গুলি হল : ধোপার পাট, মইষাল বন্ধু, কাঞ্চনমালা, শান্তি, নীলা ভেলুয়া, কমলারানীর গান, মানিক তারা বা ডাকাইতের পালা, মদনকুমার ও মধুবালা, সাঁওতাল হাঙ্গামার ছড়া, নেজাম ডাকাতের পালা, দেওয়ান ঈশা খাঁ মসনদ আলি, সুরৎ জামাল ও অধুয়া এবং ফিরোজ খাঁ  দেওয়ান।
"পূর্ববঙ্গ গীতিকা' র ৩য় খণ্ডের ২য় সংখ্যায় মোট (১১) এগারোটি পালা স্থান লাভ করেছে। সেই পালা গুলি হল : মাঞ্জুর মা, কাফেন চোরা, ভেলুয়া, হাতীখেদা, আয়নবিবি, কমল সদাগর, শ্যামরায় চৌধুরীর  লড়াই, গৌপিনী কীর্তন, সুজাতনয়ার বিলাপ ও বারতীর্থের গান।
"পূর্ববঙ্গ গীতিকা'র ৪র্থ খণ্ডের ২য় সংখ্যায় মোট (১৯) উনিশ টি পালা স্থান পেয়েছে : নছর মালুম, শিলাদেবী, রাজা ঘুঘুর পালা, নুরুন্নেহা ও কবরের কথা, মুকট রায়, ভারাইয়া রাজার কাহিনি, আন্ধাবন্ধু, বীরনারায়নের পালা, রতন ঠাকুরের পালা, পীরবাতাসী, রাজা তিলক বসন্ত, মলয়ার বারমাসী, জিরালনী, পরীবানুর হাঁহলা, সোনারায়ের জন্ম এবং সোনা বিবির পালা।
আলোচ্য পূর্ববঙ্গ গীতিকার পালাসমূহে বাঙালি জীবনের সহজ সরল বৈশিষ্ট্য গুলিই উদযাপিত হয়েছে। "Eastern Bengal Ballads'  এ দীনেশ চন্দ্র পূর্ববঙ্গ গীতিকায় ধৃত সব পালকে স্থান দেন নি।  দীনেশচন্দ্র এর সম্পাদিত পূর্ববঙ্গ গীতিকার চারটি খন্ডে ধৃত  সবগুলি কিন্তু গীতিকা নয়। সব পালা গীতিকার মর্যাদা পায় নি। নিছক বর্ণনার ফলে কোনো কোনো পালার শিল্পমান ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আবার  কোনো কোনো পালায় বাংলায় প্রকৃতির সাথে সাথে পল্লী বাংলার জনমানুষের সুঃখ দুঃখ এরূপ বর্ণিত হয়েছে যে সেগুলি যথার্থ গীতিকার মর্যাদা পেয়েছে । মাঞ্জুর মা, ধোপার পাট, মইষাল বন্ধু প্রভূতি পালায় মহুয়া পালার ন্যায় প্রেমের স্বাধীনতার সাথে উদ্দাম স্ফূর্তি পরিস্ফুট হয়। "আয়না বিবি'র পালায় হিন্দু মুসলমানের গৃহস্থালির করুন রূপ চিত্রকারে পরিস্ফুট হয়। "চৌধুরীর লড়াই' হল তথকালিন সমাজের নিখুঁত চিত্রপাট। "ভেলুয়া পালায়' নারিহৃদয়ের আর্তনাদ পরিস্ফুট হয়। এখন ও কোনো কোনো যাওগায় মুসলমান রমণীরা বিবাহ বাসরে এই পালাটি গেয়ে থাকেন। কমল সদাগর, জিরালনী এবং মাঞ্জুর মা এই তিনটি পালায় ব্যভিচারিণী  পুরমহিলার পূর্ণরূপ লক্ষ্য করা যায় । "সমসের  গাজীর গান' পালাটি হল একটি নিখুঁত ঐতিহাসিক চিত্রপট। এরূপই ভিন্ন কাহিনি অবলম্বনে পালাগুলি রচিত হয়েছে । পালাগুলি নাটকীয়  গুণে গুণান্বিত এবং পালাগুলির কাহিনী ও চিত্তাকর্ষক। এগুলি তে নানান প্রকার রস ও সুরের বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। সাধারণত পালাগুলি অধিকাংশই সংগৃহীত। কিন্তু সংগৃহীত হলে ও পালাগুলির মহত্ব ও অবদান অপরিসীম যা আজও বাংলা জগৎ এ এক অভেদ স্থান দখল করে আছে।
তথ্যসূত্র:
১.বঙ্গীয় লোক সংস্কৃতি কোষ, বরুণ কুমার চক্রবর্তী
২. বাংলাপিডিয়া
(প্রকাশিত: ০৯.০৭.২০২১)

প্রবন্ধ: সুপ্রিতা নাথ
There are no reviews yet.
0
0
0
0
0

Website Developed by:

DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Former Head
Dept. of Bengali, Karimganj College
Karimganj, Assam, India, 788710

+917002548380

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content